
দুপুরের রোদে বাজার থেকে ফেরার পথে রফিকের মাথা ঘুরছিল। তিনি ভেবেছিলেন, ‘একটু বসলে ঠিক হয়ে যাবে।’ ঘামে ভেজা জামা, তৃষ্ণা আর দুর্বলতাকে তিনি গরমের স্বাভাবিক কষ্টই ধরে নিয়েছিলেন। কিন্তু গরমে শরীর যখন পর্যাপ্তভাবে ঠান্ডা রাখতে পারে না, তখন এই ছোট মনে হওয়া সংকেতগুলো দ্রুত বিপজ্জনক হতে পারে।
বাংলাদেশের গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় রিকশাচালক, নির্মাণশ্রমিক, মাঠে কাজ করা মানুষ, শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং দীর্ঘ সময় বাইরে থাকা যে কেউ তাপজনিত অসুস্থতায় আক্রান্ত হতে পারেন। সবচেয়ে পরিচিত দুটি অবস্থা হলো হিট এক্সহসশন ও হিট স্ট্রোক। হিট স্ট্রোক জরুরি অবস্থা—সন্দেহ হলে অপেক্ষা না করে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।
হিট এক্সহসশন ও হিট স্ট্রোকের পার্থক্য কী?
হিট এক্সহসশন সাধারণত অতিরিক্ত ঘাম, পানি ও লবণ হারানো এবং গরমে দীর্ঘ সময় থাকার পর হয়। এতে শরীর দুর্বল ও অস্বস্তিকর লাগলেও ব্যক্তি সাধারণত কথা বলতে ও সাড়া দিতে পারেন। সময়মতো ঠান্ডা জায়গায় নেওয়া ও তরল দিলে অনেকের উন্নতি হয়।
হিট স্ট্রোক হলো আরও গুরুতর অবস্থা। শরীরের তাপমাত্রা বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যেতে পারে এবং মস্তিষ্কের কাজ ব্যাহত হতে পারে—যেমন বিভ্রান্তি, অস্বাভাবিক আচরণ, অজ্ঞান হওয়া বা খিঁচুনি। এটি জীবনহানিকর হতে পারে; দ্রুত জরুরি চিকিৎসা দরকার।
কোন লক্ষণগুলো খেয়াল করবেন?
হিট এক্সহসশনের সাধারণ লক্ষণ
- অতিরিক্ত ঘাম, তীব্র তৃষ্ণা ও মুখ শুকিয়ে যাওয়া
- মাথা ঘোরা, মাথাব্যথা, দুর্বলতা বা ক্লান্তি
- বমিভাব বা বমি
- পেশিতে টান বা খিঁচুনি
- ঠান্ডা, স্যাঁতসেঁতে বা ফ্যাকাশে ত্বক
- হৃদস্পন্দন দ্রুত হওয়া
হিট স্ট্রোকের বিপদসংকেত
- বিভ্রান্তি, কথা জড়িয়ে যাওয়া, অস্বাভাবিক আচরণ বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া
- খিঁচুনি
- খুব গরম ত্বক; ঘাম থাকতে পারে বা নাও থাকতে পারে
- শ্বাস দ্রুত হওয়া, তীব্র মাথাব্যথা বা বমি
- তাপমাত্রা খুব বেশি মনে হওয়া—তবে থার্মোমিটার না থাকলেও লক্ষণ দেখে সাহায্য শুরু করুন
মনে রাখুন: কারও মানসিক অবস্থা বদলে গেলে, অজ্ঞান হলে বা খিঁচুনি হলে এটিকে হিট স্ট্রোক ধরে জরুরি সাহায্য নিন।
হিট এক্সহসশনে ঘরে বসে প্রথম করণীয়
- রোদ থেকে সরান: সঙ্গে সঙ্গে ছায়া, ফ্যান বা শীতল ঘরে নিন। অপ্রয়োজনীয় কাপড় ঢিলা করুন।
- শরীর ঠান্ডা করুন: ঠান্ডা পানি দিয়ে ভেজা কাপড় কপাল, ঘাড়, বগল ও কুঁচকিতে আলতোভাবে দিন; ফ্যানের বাতাস দিন। বরফ সরাসরি ত্বকে দীর্ঘক্ষণ চেপে রাখবেন না।
- সচেতন থাকলে ধীরে ধীরে তরল দিন: ঠান্ডা পানি বা ওরস্যালাইন অল্প অল্প করে খাওয়াতে পারেন। বমি হলে, গিলতে কষ্ট হলে, খুব ঘুমঘুম/বিভ্রান্ত লাগলে মুখে কিছু দেবেন না।
- একলা ছাড়বেন না: 30 মিনিটের মধ্যে উন্নতি না হলে, বমি চললে বা উপসর্গ বাড়লে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
হিট স্ট্রোক সন্দেহ হলে এখনই যা করবেন
জরুরি সেবায় যোগাযোগ করুন বা নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে দ্রুত নিন। সাহায্য আসা বা যাওয়ার ব্যবস্থা করার সময় ঠান্ডা করার কাজ চালিয়ে যান: ছায়ায় নিন, বাড়তি কাপড় খুলে দিন, ঠান্ডা পানিতে ভেজানো কাপড় ও ফ্যান ব্যবহার করুন। সম্ভব হলে ঠান্ডা পানিতে স্পঞ্জ করুন।
অজ্ঞান, বিভ্রান্ত, খিঁচুনি হচ্ছে বা গিলতে পারছেন না—এমন কাউকে পানি, ওরস্যালাইন বা ওষুধ মুখে দেবেন না। খিঁচুনি হলে আশপাশের শক্ত জিনিস সরান, জোর করে ধরে রাখবেন না এবং মুখে কিছু ঢোকাবেন না।
বাংলাদেশের গরমে ঝুঁকি কমানোর সহজ অভ্যাস
- সকাল বা বিকেলের তুলনামূলক ঠান্ডা সময়ে বাইরে কাজ ও ব্যায়াম করার চেষ্টা করুন।
- রোদে বের হলে হালকা, ঢিলেঢালা, হালকা রঙের সুতির পোশাক, ছাতা বা টুপি ব্যবহার করুন।
- তৃষ্ণা লাগার অপেক্ষা না করে নিয়মিত পানি পান করুন। দীর্ঘ সময় ঘামলে খাবারের সঙ্গে স্বাভাবিক লবণ ও তরলের ভারসাম্য রাখুন; বিশেষ রোগ থাকলে ব্যক্তিগত পরামর্শ নিন।
- বদ্ধ গাড়ি বা বন্ধ ঘরে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি বা পোষা প্রাণীকে একা রাখবেন না।
- গরমে রোজা, ডায়রিয়া, জ্বর, কিডনি/হৃদরোগ বা কিছু ওষুধের কারণে পানিশূন্যতার ঝুঁকি বাড়তে পারে—নিজের চিকিৎসকের পরিকল্পনা অনুসরণ করুন।
- পাশের শ্রমিক, বয়স্ক প্রতিবেশী বা ছোট শিশুর দিকে নজর রাখুন; তারা তৃষ্ণা বা অসুস্থতার কথা সব সময় বলতে নাও পারেন।
যে ভুলগুলো এড়িয়ে চলবেন
- ‘ঘাম হচ্ছে, তাই হিট স্ট্রোক নয়’—এ ধারণা ভুল। হিট স্ট্রোকে ঘাম থাকতে পারে।
- অজ্ঞান বা বিভ্রান্ত ব্যক্তিকে জোর করে পানি খাওয়ানো বিপজ্জনক।
- অ্যালকোহল, অতিরিক্ত ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় বা খুব মিষ্টি সফট ড্রিংকসকে পানির বিকল্প ভাববেন না।
- শুধু জ্বরের ওষুধ খেয়ে সমস্যাকে সামলানোর চেষ্টা করবেন না; হিট স্ট্রোকের মূল সমস্যা শরীরের অতিরিক্ত তাপ, তাই দ্রুত ঠান্ডা করা ও জরুরি মূল্যায়ন জরুরি।
ডাক্তার নোট
তাপজনিত অসুস্থতার লক্ষণ অনেক সময় ডিহাইড্রেশন, সংক্রমণ বা অন্য সমস্যার সঙ্গেও মিলতে পারে। এই লেখা সচেতনতার জন্য, ব্যক্তিগত রোগনির্ণয়ের জন্য নয়। শিশু, গর্ভবতী ব্যক্তি, বয়স্ক মানুষ এবং হৃদরোগ, কিডনি রোগ বা ডায়াবেটিস থাকলে উপসর্গ হালকা মনে হলেও দ্রুত চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন।
প্রশ্নোত্তর
গরমে কতটা পানি পান করা উচিত?
সবার প্রয়োজন এক নয়—বয়স, কাজ, ঘাম, আবহাওয়া ও রোগভেদে বদলায়। নিয়মিত পানি পান করুন এবং প্রস্রাব খুব গাঢ় হলুদ, খুব কম হওয়া বা তীব্র তৃষ্ণাকে সতর্কসংকেত ভাবুন। হৃদ্যন্ত্র বা কিডনির সমস্যায় তরল সীমা থাকলে চিকিৎসকের নির্দেশই মানুন।
ওরস্যালাইন কি সবার জন্য দরকার?
অতিরিক্ত ঘাম বা ডায়রিয়ায় তরল-লবণ ঘাটতি হলে ওরস্যালাইন সহায়ক হতে পারে। তবে এটি হিট স্ট্রোকের চিকিৎসা নয় এবং অজ্ঞান/বিভ্রান্ত ব্যক্তিকে মুখে দেওয়া যাবে না।
ফ্যানের বাতাস কি যথেষ্ট?
ফ্যান সহায়ক, বিশেষ করে ভেজা কাপড় বা ঠান্ডা স্পঞ্জের সঙ্গে। কিন্তু গুরুতর লক্ষণ থাকলে শুধু ফ্যান দিয়ে অপেক্ষা না করে জরুরি চিকিৎসা নিন।

