
সকালের নাশতায় একটু ঝাল ভাজি মুখে দিতেই মনে হলো—ঠোঁটের ভেতরে যেন কাঁটা বিঁধল। আয়নায় দেখে পাওয়া গেল ছোট্ট সাদা-হলদে ঘা, চারপাশটা লাল। এমন ঘা খুব পরিচিত; কিন্তু ব্যথা এমন যে ভাত, লেবু, এমনকি কথা বলাও বিরক্তিকর হয়ে যায়।
বেশির ভাগ সাধারণ মুখের ঘা নিজে থেকেই এক থেকে দুই সপ্তাহে সেরে যায়। তবু সব ঘাকে একই নামে চালিয়ে দেওয়া ঠিক নয়: বারবার হওয়া, তিন সপ্তাহ না সারা, অস্বাভাবিক বড় হওয়া বা রক্তপাত—এসবের আলাদা গুরুত্ব আছে। NHS-এর মুখের ঘা বিষয়ক নির্দেশনা এই সীমাগুলো বিশেষভাবে উল্লেখ করে।
আগে বুঝুন: এটি কি সাধারণ মুখের ঘা?
সাধারণ মুখের ঘা সাধারণত গাল বা ঠোঁটের ভেতরে, জিহ্বায় বা মাড়ির কাছে হয়; ছোট, ব্যথাযুক্ত এবং মুখের ভেতরেই থাকে। এটি ছোঁয়াচে নয়। অন্যদিকে ঠোঁটের বাইরের কিনারায় ঝিনঝিন দিয়ে শুরু হওয়া ফোস্কার মতো ক্ষত cold sore হতে পারে—দুটোর যত্ন এক নয়। NHS তাই নিজে থেকে নাম ধরে চিকিৎসা না করতে বলে।
কেন হতে পারে—আর কোথায় অনিশ্চয়তা আছে
গালের ভেতর কামড়ে যাওয়া, ধারালো দাঁত বা খসখসে ফিলিং, ঠিকমতো না বসা দাঁত, শক্ত খাবারের আঁচড়, খুব গরম খাবারের পোড়া, কিংবা শক্ত ব্রাশের ঘষা থেকে একটি ঘা হতে পারে। মানসিক চাপ, ক্লান্তি, কিছু মানুষের ক্ষেত্রে হরমোনের পরিবর্তনও ট্রিগার হতে পারে। NHS আরও জানায় যে আয়রন, জিঙ্ক, ফোলেট বা কিছু ভিটামিনের ঘাটতি এবং কিছু ওষুধের সঙ্গেও মুখে ঘা দেখা যেতে পারে।
কিন্তু একটি ঘা দেখে নিজে থেকে ‘ভিটামিনের অভাব’ বা ‘গ্যাস্ট্রিক’ বলে সিদ্ধান্ত নেবেন না। বারবার ঘা হওয়ার পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে; কারও ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট কারণই ধরা পড়ে না। যদি ঘা ঘন ঘন হয়, চিকিৎসক উপসর্গ, খাবার, ওষুধ ও প্রয়োজন হলে পরীক্ষা মিলিয়ে কারণ খোঁজেন।
আজই আরাম পেতে ৫টি কোমল পদক্ষেপ
- খাবার নরম ও মৃদু রাখুন: ভাত-ডাল, নরম খিচুড়ি, স্যুপ বা দই (যা আপনার সহ্য হয়) বেছে নিন। ঝাল, খুব নোনতা, টক, শক্ত বা কুড়মুড়ে খাবার এবং খুব গরম পানীয় সাময়িকভাবে বাদ দিন। NHS-এর পরামর্শও মুখকে জ্বালায় এমন খাবার এড়ানো।
- পানি ও ঠান্ডা পানীয় খান: অল্প অল্প করে ঠান্ডা পানি আরাম দিতে পারে। ব্যথা বেশি হলে স্ট্র ব্যবহার করলে ক্ষতের জায়গায় ঘষা কম লাগতে পারে।
- নরম ব্রাশ ব্যবহার করুন: ধীরে দাঁত ব্রাশ করুন; ঘায়ের ওপর জোরে ঘষবেন না।
- লবণ-পানি কুলি করতে পারেন: আধা চা-চামচ লবণ এক গ্লাস কুসুম গরম পানিতে গুলে কুলি করে ফেলে দিন—গিলবেন না। এটি আরামের একটি সহজ উপায়; অলৌকিকভাবে রাতারাতি ঘা সারানোর পদ্ধতি নয়। NHS-এর নির্দেশনা এই অনুপাতটি দেয়।
- ঘর্ষণের কারণ খুঁজুন: জিহ্বা বা গাল কি কোনো ভাঙা দাঁতের ধার, ব্রেস বা দাঁতের পাটির সঙ্গে লাগছে? থাকলে শুধু কুলি নয়, কারণটিও দন্তচিকিৎসককে দেখানো দরকার।
যে ভুলগুলো ব্যথা ও ঝুঁকি বাড়াতে পারে
| ✗ যা করবেন না | কেন এড়াবেন |
|---|---|
| ঘায়ে লবণ, চুন, টুথপেস্ট বা ঝাল মসলা সরাসরি লাগানো | জ্বালা ও ক্ষত বাড়তে পারে; নিরাপদ চিকিৎসা নয়। |
| বারবার অ্যান্টিবায়োটিক বা স্টেরয়েড নিজে থেকে খাওয়া | সব মুখের ঘায় এগুলো লাগে না; সঠিক কারণ না জেনে ক্ষতি বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে। |
| ধারালো দাঁত বা খারাপ-ফিটিং পাটি উপেক্ষা করা | একই জায়গায় ঘষা চলতে থাকলে ঘা সারতে দেরি হয়। |
| তিন সপ্তাহের বেশি থাকা ঘা ‘নিজে নিজে যাবে’ ভেবে ফেলে রাখা | দীর্ঘস্থায়ী ঘা পরীক্ষা দরকার হতে পারে। NHS এ ক্ষেত্রে ডাক্তার বা দন্তচিকিৎসক দেখাতে বলে। |
ওষুধের দোকান থেকে কিছু নিলে কী মনে রাখবেন
ব্যথা কমানোর জেল, স্প্রে, মাউথওয়াশ বা অন্য পণ্য কিছু ক্ষেত্রে ফার্মাসিস্ট পরামর্শ দিতে পারেন; NHS-ও এমন বিকল্পের কথা বলে। উৎস দেখুন। তবে শিশু, গর্ভাবস্থা, কিডনি/লিভারের অসুখ, অ্যালার্জি, বা নিয়মিত ওষুধ চললে নিজে থেকে বেছে নেওয়ার আগে ফার্মাসিস্ট বা চিকিৎসককে জানান। লেবেলের বয়সসীমা ও ব্যবহারের নিয়ম মেনে চলুন।
কখন দেরি না করে ডাক্তার বা দন্তচিকিৎসক দেখাবেন
- ঘা তিন সপ্তাহের বেশি থাকে;
- স্বাভাবিকের চেয়ে বড়, অস্বাভাবিক দেখায়, গলার পেছনের দিকে হয়, বা বারবার একই জায়গায় হয়;
- রক্ত পড়ে, লালভাব/ব্যথা বাড়তে থাকে, বা জ্বরের সঙ্গে মুখ ফুলে যায়;
- খেতে বা গিলতে কষ্ট হয়, অকারণে ওজন কমে, অথবা গলা/ঘাড়ে গাঁট মনে হয়;
- ত্বক বা যৌনাঙ্গে ঘা, কিংবা ব্যথাযুক্ত ফোলা জোড়ার মতো অন্য উপসর্গও থাকে।
এই সতর্ক সংকেতগুলোর একটি থাকলেই গুরুতর রোগ নিশ্চিত হয় না। তবে অনলাইনের টিপস দিয়ে অপেক্ষা করার বদলে পরীক্ষা করানো নিরাপদ। উপরোক্ত বেশ কয়েকটি লক্ষণ NHS তালিকাভুক্ত করেছে। বাংলাদেশে তীব্র মুখ/গলা ফোলা বা শ্বাসকষ্ট হলে নিকটস্থ জরুরি বিভাগে যান; প্রয়োজন হলে ৯৯৯-এ যোগাযোগ করুন।
ডাক্তার নোট
মুখের ঘা সাধারণত ছোট সমস্যা, কিন্তু মুখে ঘর্ষণের উৎস—যেমন ভাঙা দাঁত—ঠিক না করলে একই গল্প ফিরে আসে। আর পুনরাবৃত্তি বা দীর্ঘস্থায়ী ঘার ক্ষেত্রে চিকিৎসক কেবল ঘা দেখেন না; আপনার ওষুধ, খাদ্যাভ্যাস, অন্য উপসর্গ এবং মুখের ভেতরের অবস্থা একসঙ্গে বিবেচনা করেন। এই লেখা ব্যক্তিগত রোগ নির্ণয় বা প্রেসক্রিপশনের বিকল্প নয়।
প্রশ্নোত্তর
মুখের ঘা কি ছোঁয়াচে?
সাধারণ মুখের ভেতরের ঘা ছোঁয়াচে নয়। কিন্তু ঠোঁটের বাইরের কিনারায় ফোস্কার মতো ক্ষত অন্য ধরনের সমস্যা হতে পারে; সন্দেহ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। NHS সাধারণ মুখের ঘা ও cold sore আলাদা করে ব্যাখ্যা করে।
মধু বা কোনো ঘরোয়া জিনিস লাগালে কি দ্রুত সেরে যাবে?
আরাম লাগতে পারে এমন ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা প্রমাণ নয়। ক্ষতে জ্বালা ধরায় এমন কিছু লাগানোর চেয়ে নরম খাবার, মুখ পরিষ্কার রাখা এবং ঘর্ষণ এড়ানো বেশি নিরাপদ শুরু।
মুখে ঘা হলে কি ভিটামিন বি খেলেই হবে?
নিশ্চিত নয়। কিছু পুষ্টিঘাটতি মুখের ঘার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে, কিন্তু একটি ঘা মানেই আপনার ঘাটতি আছে—এমন নয়। বারবার হলে চিকিৎসকের পরামর্শে কারণ মূল্যায়ন করুন।
তথ্যসূত্র
- NHS — Mouth ulcers (পৃষ্ঠা পর্যালোচিত: ১১ মার্চ ২০২৪)।
- NHS — Cold sores।
- Mayo Clinic — Canker sore: Symptoms and causes (রোগী-সহায়ক প্রেক্ষাপট)।

