
সকালে নাশতার আগে রওশন আরা খালার মাথা একটু ভারী লাগছিল। ছেলে বলল, ‘মা, প্রেসারটা মেপে দেখি।’ তাড়াহুড়ো করে চা খাওয়ার পর, সোফায় আধশোয়া অবস্থায় মাপা হলো—রিডিং বেশ বেশি। কিছুক্ষণ শান্ত হয়ে ঠিক ভঙ্গিতে আবার মাপার পর সংখ্যাটি বদলে গেল। এমন ঘটনা অস্বাভাবিক নয়। রক্তচাপের যন্ত্র ভালো হলেও মাপার প্রস্তুতি ও ভঙ্গি ঠিক না হলে রিডিং বিভ্রান্তিকর হতে পারে।
এই লেখা বাড়িতে রক্তচাপ মাপার কৌশল বোঝার জন্য। একটি রিডিং দেখে নিজের রোগ নির্ণয় বা ওষুধ বদলাবেন না; বারবার বেশি এলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
রক্তচাপের দুই সংখ্যা কী বোঝায়?
রক্তচাপ সাধারণত দুটি সংখ্যা দিয়ে লেখা হয়, যেমন ১২০/৮০। প্রথমটি হৃদ্পিণ্ড সংকুচিত হওয়ার সময়ের চাপ (সিস্টোলিক), দ্বিতীয়টি হৃদ্পিণ্ড বিশ্রামে থাকার সময়ের চাপ (ডায়াস্টোলিক)। উচ্চ রক্তচাপের অনেক সময় কোনো লক্ষণ থাকে না; তাই সঠিকভাবে মাপা গুরুত্বপূর্ণ।
মাপার ৩০ মিনিট আগে যা এড়াবেন
- চা, কফি, এনার্জি ড্রিংক বা ধূমপান এড়িয়ে চলুন।
- দৌড়ঝাঁপ, দ্রুত হাঁটা বা ভারী কাজ শেষে সঙ্গে সঙ্গে মাপবেন না।
- প্রস্রাবের বেগ থাকলে আগে বাথরুম সেরে নিন।
- সম্ভব হলে প্রতিদিন কাছাকাছি একই সময়ে মাপুন এবং ফল লিখে রাখুন।
ধাপে ধাপে বাড়িতে রক্তচাপ মাপার নিয়ম
- নিরিবিলি জায়গায় বসুন: চেয়ারে পিঠ ঠেকিয়ে অন্তত ৫ মিনিট বিশ্রাম নিন। কথা বলবেন না।
- পা ঠিকভাবে রাখুন: দুই পা মেঝেতে সমানভাবে রাখুন; পা ক্রস করে বসবেন না।
- বাহুতে কাফ লাগান: খালি বাহুতে, কনুইয়ের একটু ওপর কাফ বসান। জামার ওপর দিয়ে কাফ লাগালে ভুল হতে পারে।
- বাহুকে ভর দিন: টেবিল বা বালিশে বাহু এমনভাবে রাখুন যেন কাফটি হৃদ্পিণ্ডের সমতলে থাকে।
- নড়াচড়া বা কথা নয়: যন্ত্র চলার সময় স্থির থাকুন।
- দুইবার মাপুন: অন্তত ১ মিনিট বিরতি দিয়ে দুইবার মাপুন। দুই ফলের গড় নোট করুন। চিকিৎসক ভিন্ন পরিকল্পনা দিলে সেটিই অনুসরণ করুন।
যন্ত্র বাছাই ও নোট রাখার সহজ অভ্যাস
সাধারণত বাহুতে লাগানো স্বয়ংক্রিয় কাফ-মনিটর কবজির যন্ত্রের চেয়ে ব্যবহারভঙ্গির ভুলে কম প্রভাবিত হয়। আপনার বাহুর মাপের সঙ্গে কাফের মাপ মেলে কি না দেখুন—খুব ছোট বা খুব বড় কাফে ফল ভুল আসতে পারে। প্রথমবার যন্ত্র কিনলে বা সন্দেহ হলে সেটি নিয়ে চিকিৎসকের কাছে গিয়ে ক্লিনিকের যন্ত্রের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা ভালো।
খাতায় বা ফোনে তারিখ, সময়, দুই রিডিং, পালস এবং সেদিনের বিশেষ তথ্য (যেমন জ্বর, ঘুম কম, নতুন ওষুধ) লিখুন। এই ছোট তালিকাটি চিকিৎসকের সিদ্ধান্তে অনেক সহায়ক।
যে ভুলগুলো বেশি হয়
- চা বা সিগারেটের পরপরই মাপা
- কথা বলতে বলতে বা টিভি দেখতে দেখতে মাপা
- কাফ জামার ওপর লাগানো
- বাহু ঝুলিয়ে রাখা বা হৃদ্পিণ্ডের স্তরের অনেক নিচে/ওপরে রাখা
- একবার মেপেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়া
- রিডিং বেশি দেখে নিজের ইচ্ছায় প্রেসারের ওষুধ বাড়ানো, কমানো বা বন্ধ করা
কখন দ্রুত চিকিৎসা নেবেন?
রক্তচাপ খুব বেশি দেখানোর সঙ্গে বুকব্যথা, শ্বাসকষ্ট, হঠাৎ দুর্বলতা বা মুখ বেঁকে যাওয়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া, অজ্ঞান হওয়া, তীব্র মাথাব্যথা বা চোখে ঝাপসা দেখা থাকলে অপেক্ষা করবেন না—নিকটস্থ জরুরি বিভাগে যান বা স্থানীয় জরুরি সহায়তা নিন। উপসর্গ না থাকলেও অস্বাভাবিক বেশি রিডিং কয়েক মিনিট শান্ত থেকে আবার মাপুন এবং দ্রুত চিকিৎসকের নির্দেশ নিন।
ডাক্তারের নোট
বাড়ির মনিটর প্রবণতা দেখার দারুণ উপায়, কিন্তু রোগ নির্ণয়ের একমাত্র ভিত্তি নয়। বারবার উঁচু রিডিং, গর্ভাবস্থা, কিডনি রোগ, ডায়াবেটিস বা হৃদ্রোগ থাকলে রেকর্ডসহ চিকিৎসকের কাছে যান। প্রেসারের ওষুধ কেবল প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী নিন।
প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
সকালে না রাতে মাপা ভালো?
চিকিৎসক যে সময়সূচি দেন সেটিই সেরা। অনেকের ক্ষেত্রে সকাল ও সন্ধ্যায়, প্রতিবার দুইটি করে রিডিং কয়েক দিন নোট রাখতে বলা হয়। লক্ষ্য হলো একই রকম পরিস্থিতিতে ধারাবাহিক তথ্য পাওয়া।
একবার বেশি এলে কি আমার উচ্চ রক্তচাপ হয়েছে?
না। দুশ্চিন্তা, ব্যথা, ক্যাফেইন, ভঙ্গি বা কাফের ভুলে রিডিং বাড়তে পারে। একাধিক দিনের সঠিক মাপ ও চিকিৎসকের মূল্যায়ন দরকার হতে পারে।
কবজির মেশিন কি ব্যবহার করা যাবে?
ব্যবহার করা গেলেও কবজির অবস্থান বদলালে ফল বদলাতে পারে। সম্ভব হলে উপযুক্ত মাপের বাহু-কাফ মনিটর বেছে নিন এবং যন্ত্রের নির্দেশিকা অনুসরণ করুন।

