
সকালের বাজার সেরে ফিরতে ফিরতে রফিক সাহেবের মাথাটা কেমন হালকা লাগছিল। তিনি ভাবলেন, ‘একটু বিশ্রাম নিলেই ঠিক হয়ে যাবে।’ কিন্তু ঘামে জামা ভিজে গেছে, মুখ শুকিয়ে আসছে, পা দুটোও কাঁপছে। পাশে থাকা মানুষটি তাঁকে ছায়ায় বসালেন, পানি দিলেন। আধা ঘণ্টার মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরল। এই ছোট ঘটনাই মনে করিয়ে দেয়—গরমে অসুস্থতাকে শুধু ‘গরম লেগেছে’ বলে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়।
বাংলাদেশে আর্দ্র গরমে শরীর ঘামিয়ে নিজেকে ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু অতিরিক্ত তাপ, রোদ, পরিশ্রম ও পর্যাপ্ত তরল না পেলে শরীরের পানি ও লবণের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। তখন হিট এক্সহস্টশন হতে পারে; দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এটি আরও বিপজ্জনক হিটস্ট্রোকে গড়াতে পারে। এই লেখা সাধারণ স্বাস্থ্যশিক্ষার জন্য—নিজে বা অন্য কারও অবস্থা গুরুতর মনে হলে দেরি না করে জরুরি চিকিৎসা নিন।
হিট এক্সহস্টশন ও হিটস্ট্রোক এক জিনিস নয়
হিট এক্সহস্টশন সাধারণত অতিরিক্ত ঘামের সঙ্গে পানি ও লবণ কমে গেলে হয়। এতে দুর্বলতা, মাথা ঘোরা বা বমিভাব দেখা দিতে পারে। হিটস্ট্রোক বেশি গুরুতর: শরীর তাপ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হতে পারে এবং বিভ্রান্তি, অচেতনতা বা খিঁচুনির মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। WHO হিটস্ট্রোককে চিকিৎসাজনিত জরুরি অবস্থা হিসেবে বিবেচনা করে।
শুরুর লক্ষণগুলো চিনুন
সব মানুষের লক্ষণ এক রকম নয়। তবে গরমে কাজ, হাঁটা বা ব্যায়ামের পর নিচের কয়েকটি লক্ষণ একসঙ্গে থাকলে সতর্ক হোন:
- অস্বাভাবিক ক্লান্তি, দুর্বলতা বা মাথা ঘোরা
- মাথাব্যথা, বমিভাব বা বমি
- খুব তৃষ্ণা লাগা, মুখ শুকিয়ে যাওয়া
- অতিরিক্ত ঘাম, ফ্যাকাশে বা ঠান্ডা-আঠালো ত্বক
- হাত-পা বা পেটের পেশিতে টান
- প্রস্রাব কমে যাওয়া বা গাঢ় হলুদ প্রস্রাব
এসব হিট এক্সহস্টশন বা পানিশূন্যতার ইঙ্গিত হতে পারে, আবার অন্য অসুস্থতারও লক্ষণ হতে পারে। শুধু তালিকা দেখে রোগ নির্ণয় করবেন না; পরিস্থিতি ও ব্যক্তির সামগ্রিক অবস্থা দেখুন।
তখনই কী করবেন: ৪টি শান্ত, বাস্তব পদক্ষেপ
- গরম থেকে সরান: ব্যক্তি কাজ বন্ধ করে ছায়া, বাতাস চলাচল করে এমন বা ঠান্ডা জায়গায় বসুন/শুয়ে পড়ুন।
- অপ্রয়োজনীয় স্তর কমান: টাইট বা ভারী কাপড় ঢিলা করুন।
- ধীরে ধীরে তরল দিন: ব্যক্তি পুরোপুরি সচেতন এবং নিরাপদে গিলতে পারলে অল্প অল্প করে নিরাপদ পানি দিন। অতিরিক্ত ঘামে দুর্বল লাগলে সঠিক নিয়মে তৈরি ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন (ওআরএস) সহায়ক হতে পারে। অচেতন, খুব বিভ্রান্ত বা বমি করতে থাকা কাউকে মুখে কিছু খাওয়াবেন/পান করাবেন না।
- ঠান্ডা করুন ও পাশে থাকুন: ভেজা কাপড় দিয়ে শরীর মুছুন, হাওয়া করুন বা ঠান্ডা পানির স্পঞ্জ ব্যবহার করুন। উন্নতি হচ্ছে কি না লক্ষ করুন।
NHS-এর পরামর্শ অনুযায়ী, বিশ্রাম, ঠান্ডা করা ও তরল দেওয়ার পরও প্রায় ৩০ মিনিটে উন্নতি না হলে চিকিৎসা সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে। বাংলাদেশে জরুরি অবস্থা মনে হলে ৯৯৯-এ ফোন করুন বা নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যান।
যে লক্ষণগুলোতে এক মুহূর্তও দেরি নয়
হিটস্ট্রোকের আশঙ্কা হলে এটি জরুরি অবস্থা। খুব গরম শরীর, বিভ্রান্ত কথা/আচরণ, টলমল করা, দ্রুত শ্বাস বা হৃদ্স্পন্দন, খিঁচুনি, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, অথবা গরম থেকে সরানোর পরও অবস্থা না ভালো হওয়া—এসব ক্ষেত্রে দ্রুত জরুরি সাহায্য নিন। সাহায্য আসা পর্যন্ত ব্যক্তিকে ঠান্ডা জায়গায় রাখুন এবং ভেজা কাপড়/পানি ছিটিয়ে ও হাওয়া করে ঠান্ডা করার চেষ্টা করুন।
শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী মানুষ, হৃদ্রোগ/ফুসফুসের রোগ/কিডনি রোগ/ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং বাইরে বা গরম ঘরে পরিশ্রম করা মানুষ তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে থাকতে পারেন। তাঁদের নিয়মিত খোঁজ নেওয়া জরুরি।
বাংলাদেশের দিনের সঙ্গে মানানসই প্রতিরোধ পরিকল্পনা
- বাইরের শ্রম, হাঁটা বা ব্যায়াম সম্ভব হলে সকাল বা বিকেলের তুলনামূলক কম গরম সময়ে করুন।
- রোদে বের হলে হালকা, ঢিলেঢালা, হালকা রঙের কাপড় ও মাথা ঢাকার ব্যবস্থা রাখুন।
- একবারে অনেকটা নয়—কাজের ফাঁকে ফাঁকে নিরাপদ পানি পান করুন। তৃষ্ণা লাগা পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন না।
- বাসায় সরাসরি রোদ আটকাতে পর্দা/ছায়ার ব্যবস্থা করুন; রাতের বাতাস ঠান্ডা হলে ঘর বাতাস চলাচলের সুযোগ দিন।
- রিকশা, নির্মাণকাজ, কৃষিকাজ বা দীর্ঘ যাত্রায় নিয়মিত ছায়ায় বিরতি রাখুন। সহকর্মীর অসুস্থতার লক্ষণ খেয়াল করুন।
- শিশু বা পোষা প্রাণীকে বন্ধ গাড়িতে কখনো রেখে যাবেন না।
সাধারণ ভুল যেগুলো ঝুঁকি বাড়ায়
- ‘ঘাম হচ্ছে, তাই সমস্যা নেই’ ভাবা: ঘাম থাকলেও হিট এক্সহস্টশন হতে পারে; অবস্থা দেখুন।
- অসুস্থ মানুষকে জোর করে পানি খাওয়ানো: বিভ্রান্ত, অচেতন বা গিলতে না পারলে এটি বিপজ্জনক হতে পারে।
- শুধু কোমল পানীয় বা অতিরিক্ত মিষ্টি পানীয়ের ওপর ভরসা করা: পানি ও নিরাপদ তরলকে অগ্রাধিকার দিন। ডায়াবেটিস বা কিডনি রোগে ব্যক্তিগত তরল-পরামর্শ আলাদা হতে পারে।
- অ্যালকোহল বা অতিরিক্ত ক্যাফেইনকে ‘তৃষ্ণা মেটানো’ ভাবা: এগুলো সবার জন্য উপযুক্ত পছন্দ নয় এবং গরমে শরীরের আরাম নাও দিতে পারে।
- উপসর্গ কমলেই সঙ্গে সঙ্গে আবার রোদে কাজ শুরু করা: পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বিশ্রাম নিন।
ডাক্তারের নোট
গরমে দুর্বলতা মানেই সবসময় পানিশূন্যতা নয়—রক্তে শর্করা কমে যাওয়া, সংক্রমণ, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা হৃদ্যন্ত্রের সমস্যাও থাকতে পারে। বিশেষ করে যাঁদের কিডনি, হৃদ্রোগ বা ডায়াবেটিস আছে, অথবা প্রস্রাব বাড়ায় এমন ওষুধ খান, তাঁদের নিজের মতো করে ‘বেশি বেশি পানি’ বা ওআরএসের পরিমাণ বদলানো ঠিক নয়। পুনঃপুন অসুস্থতা, বুকব্যথা, শ্বাসকষ্ট বা অস্বাভাবিক দুর্বলতা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
গরমে দিনে ঠিক কত লিটার পানি পান করব?
সবার জন্য এক সংখ্যা ঠিক নয়। বয়স, শরীরের অবস্থা, কিডনি/হৃদ্রোগ, গর্ভাবস্থা, আবহাওয়া ও কাজের ধরন অনুযায়ী প্রয়োজন বদলায়। তৃষ্ণা, প্রস্রাবের রং এবং চিকিৎসকের ব্যক্তিগত পরামর্শ মিলিয়ে পরিকল্পনা করুন।
ওআরএস কি প্রতিদিন গরমে খাওয়া দরকার?
সুস্থ অধিকাংশ মানুষের দৈনন্দিন তৃষ্ণার জন্য পানি যথেষ্ট। অতিরিক্ত ঘাম, ডায়রিয়া বা বমিতে ওআরএসের ভূমিকা থাকতে পারে, তবে প্যাকেটের নির্দেশনা মেনে তৈরি করুন। কিডনি, হৃদ্রোগ বা লবণ নিয়ন্ত্রণের সমস্যা থাকলে চিকিৎসককে জিজ্ঞেস করুন।
হিটস্ট্রোকে ঘাম না হওয়াই কি একমাত্র লক্ষণ?
না। কারও ত্বক গরম হলেও ঘাম থাকতে পারে। বিভ্রান্তি, অজ্ঞানতা, খিঁচুনি, দ্রুত শ্বাস বা দ্রুত অবনতি—এসবই বেশি গুরুত্বপূর্ণ জরুরি সংকেত।
শিশু গরমে নিস্তেজ লাগলে কী করব?
তাকে ঠান্ডা জায়গায় নিন, হালকা কাপড় পরান এবং সে স্বাভাবিকভাবে গিলতে পারলে অল্প অল্প তরল দিন। কান্নায় চোখের পানি না থাকা, প্রস্রাব কমে যাওয়া, খুব ঘুমঘুম/নিস্তেজ হওয়া, বিভ্রান্তি বা খিঁচুনি হলে দ্রুত চিকিৎসা নিন।
মনে রাখুন
গরমে নিরাপত্তা কোনো জটিল কাজ নয়: রোদ ও ভারী কাজের সময় কমানো, ছায়ায় বিরতি, নিরাপদ পানি, হালকা পোশাক এবং অসুস্থ মানুষের পাশে থাকা—এই কয়েকটি অভ্যাস বড় ঝুঁকি কমাতে পারে। তবে বিভ্রান্তি, অচেতনতা, খিঁচুনি বা দ্রুত অবনতিকে কখনো ঘরোয়া সমস্যা ভেবে অপেক্ষা করবেন না।

