কানে পানি ঢুকলে কী করবেন: নিরাপদ উপায়, যা করবেন না ও কখন ডাক্তার দেখাবেন

সকালের গোসলের পর রিমা বারবার মাথা কাত করছিলেন। এক কানে যেন পানি আটকে আছে—শব্দ একটু ভোঁতা, অস্বস্তিও হচ্ছে। তাড়াহুড়োয় তিনি কটন বাড খুঁজলেন। এখানেই থামা ভালো। বেশির ভাগ সময়ে কানে ঢোকা পানি নিজে থেকেই বেরিয়ে যায়; কিন্তু খোঁচাখুঁচি করলে পানি আরও ভেতরে যেতে পারে, কানের ত্বক ক্ষত হতে পারে বা ময়লা ঠেলে জমে যেতে পারে।

বৃষ্টি, গোসল, পুকুরে নামা বা সাঁতারের পর এই সমস্যা বাংলাদেশে খুবই পরিচিত। নিচের পরামর্শগুলো সাধারণ তথ্য—তীব্র ব্যথা, কানে পুঁজ/রক্ত, জ্বর বা শ্রবণ কমে গেলে নিজে চিকিৎসা না করে ডাক্তার দেখান।

কানে পানি ঢুকলে প্রথমে যা করবেন

  • শান্ত থাকুন ও আক্রান্ত কান নিচের দিকে রাখুন: মাথা আলতো করে ওই দিকেই কাত করুন। কানের লতি ধরে খুব হালকা টান দিন এবং চোয়াল নড়ান বা হাই তোলার মতো করুন।
  • পাশ ফিরে শুয়ে থাকুন: আক্রান্ত কান নিচে রেখে কয়েক মিনিট কাত হয়ে থাকুন। মাধ্যাকর্ষণ অনেক সময় যথেষ্ট।
  • বাইরের অংশ শুকান: পরিষ্কার নরম তোয়ালে বা কাপড় দিয়ে শুধু কানের বাইরের অংশ মুছুন।
  • হালকা উষ্ণ বাতাস—দূর থেকে: প্রয়োজন হলে হেয়ার ড্রায়ার সবচেয়ে কম তাপ ও কম গতিতে, কান থেকে অন্তত ৩০ সেন্টিমিটার দূরে রেখে অল্প সময় ব্যবহার করা যায়। গরম বাতাস বা খুব কাছে ধরা ঠিক নয়।

যা একদম করবেন না

  • কটন বাড, চাবি, কলমের ঢাকনা, কাঠি বা আঙুল কানে ঢোকাবেন না।
  • ব্যথা বা কানের পর্দায় ছিদ্রের ইতিহাস থাকলে নিজের ইচ্ছায় তেল, অ্যালকোহল, ভিনেগার বা ড্রপ ব্যবহার করবেন না।
  • কান থেকে তরল বের হলে বা ব্যথা বাড়লে সাঁতার/পুকুরে নামা বন্ধ রাখুন, যতক্ষণ না স্বাস্থ্যকর্মী পরামর্শ দেন।
  • শিশুর কানে কিছু আটকে আছে মনে হলে জোর করে বের করার চেষ্টা করবেন না।

পানি আটকে থাকলে কেন সমস্যা হতে পারে?

কানের বাইরের নালিতে আর্দ্রতা দীর্ঘক্ষণ থাকলে জীবাণু বা ছত্রাক বাড়ার অনুকূল পরিবেশ হতে পারে। তখন বাইরের কানের সংক্রমণ (otitis externa বা “swimmer’s ear”) দেখা দিতে পারে। তবে প্রতিবার পানি ঢোকা মানেই সংক্রমণ নয়। ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে যদি কানে একজিমা থাকে, বারবার কটন বাড ব্যবহার করা হয়, বা আগে কানের অস্ত্রোপচার/পর্দার সমস্যা থাকে।

কখন দ্রুত ডাক্তার দেখাবেন

  • ব্যথা তীব্র হচ্ছে, কান টানলে বা চিবোলে ব্যথা লাগে
  • কান থেকে পুঁজ, দুর্গন্ধযুক্ত তরল বা রক্ত বের হয়
  • জ্বর, মাথা ঘোরা, বমিভাব বা হঠাৎ শুনতে কম লাগে
  • ২৪ ঘণ্টার বেশি অস্বস্তি থাকে বা বারবার একই সমস্যা হয়
  • ডায়াবেটিস, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম, কানের পর্দায় ছিদ্র বা কানের অপারেশনের ইতিহাস আছে

বর্ষা ও সাঁতারের সময় প্রতিরোধের সহজ অভ্যাস

গোসল বা সাঁতারের পর বাইরের কান আলতো করে শুকিয়ে নিন। পরিষ্কার পানি ছাড়া পুকুর বা জলাশয়ে নামলে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। বারবার সমস্যা হলে ইএনটি বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলুন—সবার জন্য একই ইয়ারপ্লাগ বা ড্রপ উপযুক্ত নয়।

ডাক্তার নোট

কানে পানি ঢুকেছে মনে হলেই অ্যান্টিবায়োটিক ড্রপ শুরু করার দরকার নেই। সংক্রমণ, ময়লা জমা, পর্দার অবস্থা ও অন্য কারণ দেখে চিকিৎসা আলাদা হয়। বিশেষ করে কানের পর্দায় ছিদ্র থাকলে কিছু ড্রপ ক্ষতিকর হতে পারে। নিরাপদ সিদ্ধান্ত হলো: কান খোঁচাবেন না, শুকনো রাখুন, আর সতর্ক সংকেত থাকলে পরীক্ষা করান।

সাধারণ ভুল ধারণা

“কটন বাডে পানি বের হয়”—আসলে এটি অনেক সময় পানি বা ময়লাকে ভেতরে ঠেলে দেয় এবং নালির নরম ত্বকে আঁচড় ফেলে। “ব্যথা না থাকলে যা খুশি ঢালা যায়”—এটিও ঠিক নয়; পর্দার অবস্থা না জেনে ঘরোয়া তরল বা ড্রপ ব্যবহার ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

প্রশ্নোত্তর

কতক্ষণে পানি বের হওয়া স্বাভাবিক?

অনেক ক্ষেত্রে মাথা কাত করা ও বাইরের অংশ শুকানোর পর অল্প সময়েই স্বস্তি আসে। তবে এক দিন পার হলেও বন্ধভাব বা অস্বস্তি থাকলে পরীক্ষা করানো ভালো।

কানে পানি ঢুকলে কি সঙ্গে সঙ্গে সংক্রমণ হয়?

না। সংক্রমণ হতে পারে যদি আর্দ্রতা দীর্ঘক্ষণ থাকে বা কানের নালির ত্বক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ব্যথা, চুলকানি, ফোলা বা তরল বের হওয়া হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

শিশুর কানে পানি ঢুকলে কী করব?

শিশুকে কটন বাড বা কোনো বস্তু দিয়ে কান পরিষ্কার করতে দেবেন না। হালকা করে কাত করান, বাইরের অংশ মুছুন এবং ব্যথা, জ্বর, কান ধরা বা কান থেকে তরল বের হলে শিশু বিশেষজ্ঞ বা ইএনটি চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।

তথ্যসূত্র

এই লেখা স্বাস্থ্যশিক্ষামূলক; এটি ব্যক্তিগত রোগনির্ণয় বা চিকিৎসার বিকল্প নয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *