
দুপুরের রোদে শরীর যখন বলে ‘আর পারছি না’
জুলাইয়ের এক দুপুরে বাজার থেকে ফিরে রফিক সাহেব দেখলেন—মাথা ঘুরছে, শরীর ভিজে যাচ্ছে ঘামে, গা গুলাচ্ছে। তিনি ভাবলেন, ‘একটু শুয়ে নিলেই ঠিক হয়ে যাবে।’ অনেক সময় এমনটাই হয়; কিন্তু অতিরিক্ত গরমে এই লক্ষণগুলো হিট এক্সহস্টশন (তাপজনিত অবসাদ) হতে পারে। সময়মতো ঠান্ডা জায়গায় যাওয়া ও তরল পান করা না হলে কিছু ক্ষেত্রে অবস্থা আরও বিপজ্জনক হিটস্ট্রোকে গড়াতে পারে।
এই লেখা সাধারণ স্বাস্থ্যতথ্য। কারও অবস্থা গুরুতর মনে হলে অনলাইনে অপেক্ষা না করে জরুরি চিকিৎসা নিন।
হিট এক্সহস্টশন আর হিটস্ট্রোক এক নয়
গরম ও আর্দ্রতায় শরীর ঘাম দিয়ে নিজেকে ঠান্ডা রাখে। ঘাম, কম পানি পান, ভারী কাজ বা দীর্ঘক্ষণ রোদে থাকার কারণে শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যাহত হলে হিট-সম্পর্কিত অসুস্থতা হতে পারে। হিট এক্সহস্টশনে সাধারণত অতিরিক্ত ঘাম, দুর্বলতা ও মাথা ঘোরার মতো উপসর্গ থাকে। হিটস্ট্রোক জরুরি অবস্থা: এতে বিভ্রান্তি, অজ্ঞান হওয়া বা খিঁচুনির মতো স্নায়বিক লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
হিট এক্সহস্টশনের সাধারণ লক্ষণ
- অতিরিক্ত ঘাম, ঠান্ডা বা স্যাঁতসেঁতে ত্বক
- মাথা ঘোরা, মাথাব্যথা, দুর্বল বা খুব ক্লান্ত লাগা
- বমি বমি ভাব বা বমি
- পেশিতে টান বা খিঁচ
- তৃষ্ণা, দ্রুত নাড়ি, খিটখিটে বা অস্বস্তি লাগা
লক্ষণ সবার এক রকম নাও হতে পারে। শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী, বাইরে কাজ করা মানুষ এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভোগা ব্যক্তির ক্ষেত্রে গরমের প্রভাব দ্রুত বাড়তে পারে।
প্রথম ৩০ মিনিটে নিরাপদ করণীয়
- গরম থেকে সরান: ছায়া, ফ্যান বা শীতল ঘরে নিন। ভারী কাজ থামান।
- অতিরিক্ত কাপড় ঢিলা করুন: ভেজা কাপড় বদলান; ঠান্ডা ভেজা কাপড়, ফ্যান বা ঠান্ডা পানি দিয়ে শরীর আলতোভাবে ঠান্ডা করুন।
- সচেতন থাকলে অল্প অল্প করে তরল দিন: নিরাপদ পানি বা ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন (ওআরএস) ছোট চুমুকে দিতে পারেন। বমি হলে বা গিলতে কষ্ট হলে জোর করে কিছু খাওয়াবেন না।
- একলা রাখবেন না: লক্ষণ কমছে কি না দেখুন। সাধারণত দ্রুত ঠান্ডা করা ও বিশ্রামে উন্নতি হওয়া উচিত।
অ্যালকোহল বা খুব বেশি ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় দিয়ে ‘তৃষ্ণা মেটানো’ ভালো সমাধান নয়। অসুস্থ ব্যক্তিকে বরফঠান্ডা পানিতে ডুবিয়ে দেওয়া, অজ্ঞান ব্যক্তিকে পানি খাওয়ানো, বা নিজের মতো করে ওষুধ দেওয়া থেকেও বিরত থাকুন।
হিটস্ট্রোকের সতর্ক সংকেত: এটি জরুরি অবস্থা
নিচের যেকোনো লক্ষণ থাকলে হিটস্ট্রোকের আশঙ্কা ধরে জরুরি সাহায্য নিন—বাংলাদেশে ৯৯৯-এ কল করুন বা দ্রুত নিকটস্থ জরুরি বিভাগে যান:
- বিভ্রান্ত কথা বলা, আচরণ বদলে যাওয়া, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা খিঁচুনি
- শরীর খুব গরম লাগা এবং দ্রুত অবনতি
- হাঁটতে না পারা, শ্বাসকষ্ট, বা বারবার বমি
- ঠান্ডা জায়গায় নেওয়া ও প্রাথমিক যত্নের পরও ৩০ মিনিটের মধ্যে উন্নতি না হওয়া
সাহায্যের অপেক্ষায় থাকলে ব্যক্তিকে ঠান্ডা জায়গায় নিন, বাড়তি কাপড় সরান, ভেজা কাপড় ও ফ্যান দিয়ে ঠান্ডা করুন। তিনি বিভ্রান্ত, অজ্ঞান বা খিঁচুনিতে থাকলে মুখে পানি, ওআরএস বা খাবার দেবেন না।
বাংলাদেশের গরমে প্রতিরোধের সহজ রুটিন
- রোদে বের হলে সকাল বা বিকেলের তুলনামূলক শীতল সময় বেছে নিন; দুপুরের ভারী কাজ ভাগ করে করুন।
- সঙ্গে নিরাপদ পানির বোতল রাখুন এবং তৃষ্ণা লাগার আগেই নিয়মিত পানি পান করুন।
- হালকা, ঢিলেঢালা, বাতাস চলাচল করে এমন পোশাক; ছাতা বা টুপি ব্যবহার করুন।
- ঘর গরম হলে পর্দা টানুন, বাতাস চলাচল রাখুন, সম্ভব হলে কয়েক ঘণ্টা শীতল স্থানে থাকুন।
- শিশু, বয়স্ক বা অসুস্থ কাউকে বন্ধ গাড়িতে কখনো রেখে যাবেন না।
- জ্বর, ডায়রিয়া, বমি বা কিডনি/হৃদ্রোগের কারণে তরল গ্রহণে বিধিনিষেধ থাকলে ব্যক্তিগত পরামর্শের জন্য চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন।
যে ভুলগুলো ঝুঁকি বাড়ায়
- ‘ঘাম হচ্ছে, তাই সমস্যা নেই’ ভেবে দীর্ঘক্ষণ রোদে কাজ চালিয়ে যাওয়া
- অজ্ঞান বা বিভ্রান্ত ব্যক্তিকে পানি খাওয়ানোর চেষ্টা
- লক্ষণ থাকা সত্ত্বেও আবার খেলাধুলা বা ভারী কাজে ফেরা
- শিশু ও বয়স্কদের তৃষ্ণা না লাগলে পানি দরকার নেই ধরে নেওয়া
ডাক্তার নোট
তাপজনিত অসুস্থতা অনেক সময় সাধারণ দুর্বলতা, ভাইরাল জ্বর বা পেটের সমস্যার মতো মনে হতে পারে। কিন্তু রোদ বা গরমে থাকার পর মাথা ঘোরা, বমি, অতিরিক্ত ঘাম, দুর্বলতা বা আচরণে পরিবর্তন হলে বিষয়টি গুরুত্ব দিন। বিশেষ করে বিভ্রান্তি, অজ্ঞান হওয়া, খিঁচুনি, শ্বাসকষ্ট বা দ্রুত অবনতি হলে ঘরোয়া ব্যবস্থার সীমা পেরিয়ে গেছে—জরুরি চিকিৎসাই অগ্রাধিকার।
প্রশ্নোত্তর
হিট এক্সহস্টশনে কি ওআরএস খাওয়া যায়?
ব্যক্তি সচেতন থাকলে এবং গিলতে পারলে অল্প অল্প করে ওআরএস বা নিরাপদ পানি দেওয়া যেতে পারে। তবে বিভ্রান্তি, অজ্ঞান হওয়া বা বারবার বমি থাকলে মুখে কিছু দেবেন না; জরুরি সাহায্য নিন।
জ্বর থাকলেই কি হিটস্ট্রোক?
না। জ্বরের নানা কারণ আছে। তবে অতিরিক্ত গরমে থাকার পর শরীর খুব গরম, বিভ্রান্তি, অজ্ঞান হওয়া বা খিঁচুনি থাকলে হিটস্ট্রোকের সম্ভাবনা বিবেচনা করে দ্রুত চিকিৎসা নিন।
ফ্যান কি যথেষ্ট?
ফ্যান শীতল হতে সাহায্য করতে পারে, বিশেষ করে ভেজা কাপড় বা ঠান্ডা পানির সঙ্গে। কিন্তু গুরুতর লক্ষণ থাকলে ফ্যানের ওপর ভরসা করে সময় নষ্ট না করে জরুরি সেবা নিন।

